• ৩রা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৮ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ভাঙা ঘরকে গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ, তালিকায় চেয়ারম্যানের কলেজপড়ুয়া ছেলেও

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত নভেম্বর ২, ২০২৬, ২০:৪৩ অপরাহ্ণ
ভাঙা ঘরকে গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ, তালিকায় চেয়ারম্যানের কলেজপড়ুয়া ছেলেও
সংবাদটি শেয়ার করুন....

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরগুনার তালতলীতে সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও পরিত্যক্ত ও জরাজীর্ণ ভবনকে গুদাম দেখিয়ে ডিলার নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে, আবার কোথাও খুচরা সার বিক্রেতা ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের ছেলেকে দেওয়া হয়েছে ডিলার নিয়োগ। এসব নিয়োগে নীতিমালা মানা হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

গত ৭ অক্টোবর বরগুনা জেলার ৪৪টি ইউনিয়নে ৪৪ জন অস্থায়ী সার ডিলার নিয়োগ চূড়ান্ত করতে নির্দেশ দেয় মন্ত্রণালয়। নীতিমালা অনুযায়ী, ডিলার নিয়োগের জন্য বিক্রয়কেন্দ্রের পাশে নিজস্ব বা ভাড়া করা কমপক্ষে পাঁচ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। ভাড়া করা গুদামের ক্ষেত্রে লিখিত চুক্তিও বাধ্যতামূলক। তালতলীর কয়েকটি নিয়োগে এসব শর্ত মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

কৃষি বিভাগ বলছে, নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পরিত্যক্ত রাইস মিলকে দেখানো হয়েছে গুদাম

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তালতলী উপজেলার পচাকোড়ালিয়া ও শারিকখালী ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগ নিয়ে এসব অভিযোগ উঠেছে। পচাকোড়ালিয়া ইউনিয়নে পরিত্যক্ত একটি রাইস মিলের জরাজীর্ণ ঘরকে গুদাম দেখিয়ে ডিলার মনোনয়নের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে শারিকখালী ইউনিয়নে নিবন্ধিত খুচরা সার বিক্রেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফারুক খানের ছেলে নেছার উদ্দিনকে সার ডিলার হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মনোনীত দুই ডিলার ও সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যান।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ঘরটির ভেতরে পরিত্যক্ত রাইস মিলের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। চারপাশের বেড়া ভাঙা। টিনের চালে অসংখ্য ছিদ্র। মেঝেতে রয়েছে বড় গর্ত। এমন জরাজীর্ণ ঘরটিকেই গুদাম দেখিয়ে ওই ইউনিয়নে সার ডিলার মনোনীত হয়েছেন মো. রাকিবুল ইসলাম।

গুদামের মালিক রিপন চন্দ্র শীলের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে ঘর ভাড়ার কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি। তাদের মধ্যে মৌখিক আলোচনা হয়েছে।

রিপন চন্দ্র শীল বলেন, রাকিবুল ইসলামের সঙ্গে ফোনে কথা হয়েছে। ২০ হাজার টাকা অগ্রিম এবং মাসিক পাঁচ হাজার টাকা ভাড়ায় কথা হয়েছে। কোনো লিখিত চুক্তি হয়নি। তিনি ঢাকা থেকে এসে পরে লিখিত চুক্তি করবেন। এখন সেখানে কী কী কাগজপত্র জমা দিয়েছেন, তা তার জানা নেই।

তবে সব চুক্তিপত্র রয়েছে দাবি করে রাকিবুল ইসলাম মুঠোফোনে বলেন, বাজারে তার যে গুদামঘরটি রয়েছে, সেটির মালিক তাকে মেরামত করে দেওয়ার কথা বলেছিলেন। কিন্তু এখনো ঠিক করে দেননি। এ ছাড়া তার আরও দুটি গুদাম রয়েছে।

এই গুদামের মালিকের সঙ্গে লিখিত চুক্তি না হওয়ার অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, তার সব চুক্তিপত্রই রয়েছে। প্রতিপক্ষরা তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।

 

পচাকোড়ালিয়া এলাকার ব্যবসায়ী ইসমাইল পেদ্যা বলেন, কিছুদিন আগে তার দোকানের সামনে পরিত্যক্ত মিলটি কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা পরিদর্শন করে গেছেন। তখন শুনেছিলেন, এটি সারের গুদাম হবে। এখন এলাকার সবার মুখে শুনছেন, ভাঙা ঘরটিকেই সারের গুদাম হিসেবে দেখানো হয়েছে।

 

ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সাবেক ইউপি সদস্য জাফর মিয়া বলেন, এ এলাকায় ডিলার হওয়ার জন্য ১০ জন আবেদন করেছিলেন। এর মধ্যে শুধু রাকিবুল ইসলামের আবেদন চূড়ান্ত হয়েছে। অথচ তিনি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থী বলে শুনেছেন। যে গুদাম ভাড়ার চুক্তিপত্র আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়ার কথা, সেটির মালিকের সঙ্গে তার কোনো লিখিত চুক্তি নেই। তার ধারণা, জালিয়াতির মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে তিনি চূড়ান্ত হয়েছেন।

 

পচাকোড়ালিয়া এলাকার বাসিন্দা বেলাল হোসেন মিলন বলেন, একটি পরিত্যক্ত ঘরকে কীভাবে গুদাম দেখিয়ে ডিলারশিপ দেওয়া হলো, তা তাদের বোধগম্য নয়। ঘরটি কোনোভাবেই সার মজুতের উপযুক্ত নয়। প্রকৃত ব্যবসায়ীরা আবেদন করেও ডিলার হতে পারেননি। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

 

খুচরা সার বিক্রেতার ছেলেও ডিলার

পচাকোড়ালিয়া ইউনিয়নের পাশাপাশি শারিকখালী ইউনিয়নেও ডিলার নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, একই পরিবারের কোনো সদস্যের ডিলারশিপ বা যথাযথ কর্তৃপক্ষের দেওয়া খুচরা বিক্রেতার পরিচয়পত্র থাকলে ওই পরিবারের অন্য সদস্য ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা হতে পারবেন না।

তবে শারিকখালী ইউনিয়নে নিবন্ধিত খুচরা সার বিক্রেতা ও ইউপি চেয়ারম্যান মো. ফারুক খানের ছেলে নেছার উদ্দিনকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। এ নিয়েই স্থানীয়দের অভিযোগ, একই পরিবারের সদস্য খুচরা সার বিক্রেতা হওয়ার পরও নীতিমালা লঙ্ঘন করে নেছার উদ্দিনকে ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

শারিকখালী ইউনিয়নের কচুপাত্রা এলাকার বাসিন্দা বায়জিদ হোসাইন হৃদয় বলেন, নেছার উদ্দিন ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম লীগের পদধারী নেতা। তার বাবা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং খুচরা সার বিক্রেতা। অথচ নীতিমালায় একই পরিবারের কেউ খুচরা সার বিক্রেতা থাকলে অন্য সদস্যের ডিলার হওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও নেছারকে ডিলার মনোনীত করা হয়েছে।

শারিকখালী ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকার বাসিন্দা মাসুদ খান বলেন, নেছার ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের ছেলে। তিনি বরিশালে পড়াশোনা করেন এবং মাঝেমধ্যে এলাকায় আসেন। তিনি ব্যবসায়ী নন। একজন শিক্ষার্থী পড়াশোনার পাশাপাশি কীভাবে ডিলারের ব্যবসা পরিচালনা করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এতে কৃষকেরা সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।

বাবা—ছেলের ভিন্ন বক্তব্য

নিজের নামে খুচরা সার বিক্রেতার পরিচয় থাকলেও বর্তমানে ব্যবসা পরিচালনা করেন না বলে দাবি করেছেন শারিকখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. ফারুক খান। জাগো নিউজকে তিনি বলেন, তার ছেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি ব্যবসাও করে। তিনি অনেক আগেই সার ডিলারশিপ ছেড়ে দিয়েছেন। তার নামে অন্য একজন ব্যবসা পরিচালনা করেন। সেটি এখনো চালু আছে কি না, তা—ও তিনি জানেন না।

অন্যদিকে বাবা খুচরা সার ডিলার নন বলে জানেন দাবি করে সদ্য মনোনীত ডিলার নেছার উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, তিনি বাবার সঙ্গে থাকেন না। পড়াশোনার পাশাপাশি তালতলীতে তার আরও ব্যবসা রয়েছে। তার বাবা খুচরা ডিলার নন বলেই তিনি জানেন। তিনি নিজের যোগ্যতায় আবেদন করেছেন। কে ডিলার আছেন বা নেই, তা তিনি জানেন না।

তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস

সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালা অনুযায়ী হয়েছে বলে দাবি করেছেন তালতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু জাফর মো. ইলিয়াস তিনি জানান, এ বিষয়ে তার কিছু বলার নেই। নীতিমালা অনুসরণ করেই নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে। উপজেলা থেকে জেলা কমিটির কাছে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। গুদামগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করা হয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সব গুদাম পরিদর্শন করেই মতামত দেওয়া হয়েছে।

তালতলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অতীশ সরকার জানান, জেলা প্রশাসকের কাছে কিছু অভিযোগ এসেছে বলে তিনি শুনেছেন। তবে এখনো তার কাছে লিখিত অভিযোগ আসেনি। সার ডিলার নিয়োগ চূড়ান্ত করেছে মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের আদেশে জেলা থেকে পাঠানো সুপারিশের ক্রমিক অনুযায়ী নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে কৃষি অফিসের নেতৃত্বে একটি ফিল্ড মনিটরিং টিম আবেদনগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করেছে। এরপর কিছু আবেদন বাছাই করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে। যেসব অভিযোগ এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ নির্দেশনা দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ বিষয়ে বরগুনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এস এম বদরুল আলম বলেন, তারা ইতিমধ্যে লিখিত ও মৌখিকভাবে কয়েকটি অভিযোগ পেয়েছেন। সরকার নির্ধারিত নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটলে বিধি অনুযায়ী তদন্ত করা হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বি.দ্র: এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি। © জনতার বরিশাল