• ১৪ই মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৩১শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ঝুঁকির মুখে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পাঁচ কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত এপ্রিল ২৯, ২০২৬, ২২:২০ অপরাহ্ণ
ঝুঁকির মুখে বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের পাঁচ কোটি টাকা
সংবাদটি শেয়ার করুন....

নিজস্ব প্রতিবেদক : জনগনের ট্যাক্সের পাঁচ কোটি টাকা হারাতে বসেছে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটায় জমি কেনা বাবদ ওই টাকা দিয়ে বায়না চুক্তি করা হয়েছিল। আয় বাড়ানোর পাশাপাশি সমুদ্র সৈকতে নিজস্ব একটি ঠিকানা রাখার টার্গেটে চুক্তিটি করেছিল নগর ভবন। বিসিসি’র সাবেক প্রশাসক, বন-পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের বর্তমান সচিব রায়হান কাওছার’র সময়ে হাতে নেয়া হয় প্রকল্পটি। পরবর্তিতে মামলা সংক্রান্ত জটিলতা আর প্রশাসক বদলের চক্করে আটকে যায় সব। বর্তমানে মামলার ঝামেলা শেষ হলেও বাকি টাকা দিয়ে জমিটি নিজের নামে করার ব্যাপারে কোন আগ্রহ নেই নগর ভবনের। এদিকে বায়না চুক্তির মেয়াদও শেষের পথে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দলিল না হলে বায়না করা ৫ কোটি টাকা ফেরত পাওয়া প্রশ্নে দেখা দেবে আইনী জটিলতা। সেক্ষেত্রে এই টাকা আর নগর ভবনে ফেরত আসবে কিনা তাই নিয়েও রয়েছে সন্দেহ।

৫ আগষ্টের পর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পান বরিশালের তখনকার বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার। নগরীর নানা উন্নয়ন কর্মকান্ড সামাল দেয়ার পাশাপাশি বিসিসি’র আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেন তিনি। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে হাতে নেয়া হয় কুয়াকাটায় জমি কেনার প্রকল্প। সেসময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে কুয়াকাটায় রির্সোট স্থাপন কিংবা জমি কেনাবেচার মাধ্যমে নগর ভবনের আয় বাড়ানোর জন্য কথা বলেন তিনি।

বর্তমানে বন ও পরিবেশ মন্ত্রনালয়ের সচিব পদে থাকা রায়হান কাওছার তখন বলেন, ‘সিটি কর্পোরেশনের মাসিক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই জমি কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সমুদ্র সৈকতের কাছে কেনা হবে ওই জমি। আপাততঃ আমরা জমি কিনে রাখবো। রাজনৈতিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরবর্তি সিদ্ধান্ত নেবেন। চাইলে তারা সেখানে রিসোর্ট গড়ে স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা করতে পারেন। অথবা ক্রয়কৃত জমি উচ্চ মূল্যে বিক্রি করেও এককালীন একটা বড় অংকের টাকা আয় করতে পারবে বিসিসি। কুয়াকাটা পর্যটন কেন্দ্র যেহেতু ক্রমবর্ধমান তাই সেখানে প্রায় প্রতিদিনই বাড়ছে জমির দাম। এই বিবেচনায় রিসোর্ট না করে কয়েক বছর পর জমি বিক্রি করলেও বিনিয়োগের কয়েক গুন বেশী লাভ উঠে আসবে।’

সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গত বছরের ১৯ অক্টোবর পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে জমি বিক্রয়ে আগ্রহীদের কাছ থেকে আবেদন আহবান করে বিসিসি। আবেদন আসার পর যাচাই বাছাই করে সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন ৭ একর ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ জমি কেনার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রতি শতাংশ ২ লাখ ৩৩ হাজার টাকা দরে জমির মূল্য ধরা হয় ১৭ কোটি টাকা। ওই বছরের নভেম্বর মাসে জমির মালিক মোস্তফা শিবলীর সাথে কেনা বেচা সংক্রান্ত বায়না চুক্তি সম্পাদন করে বিসিসি। চুক্তি অনুযায়ী বিক্রেতাকে পরিশোধ করা হয় ৫ কোটি টাকা। জমির দাম বাবদ ধরা ১৭ কোটির মধ্যে বাকি ১২ কোটি টাকা পরিশোধ করে চুড়ান্ত দলিল সম্পাদন হবে বলে উল্লেখ করা হয় বায়না চুক্তিতে। আলোচ্য জমিতে ৫টি সম্পুর্ন এবং ৮টি অর্ধ নির্মিত ভবনসহ বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে। এদিকে কুয়াকাটায় বিসিসি’র জমি ক্রয় উদ্যোগের বিরোধীতায় নামে বাম সংগঠনের নেতারা। নগরে বিরাজমান নানা সমস্যার দিকে বিসিসি কর্তৃপক্ষের কোন নজর নেই অথচ তারা কুয়াকাটায় শত কোটি টাকার রিসোর্ট করছে উল্লেখ করে প্রচারনা চালাতে থাকে তারা। একপর্যায়ে জমি কেনা আটকাতে হাইকোর্টে একটি রিট করেন গনসংহতি আন্দোলনের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সমন্বয়কারী বরিশালের আইনজীবি আব্দুর রশিদ নিলু। রিটের প্রেক্ষিতে গত বছরের ১৭ নভেম্বর দেয়া এক রায়ে কুয়াকাটায় বিসিসি’র জমি কেনার উপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেয় হাইকোর্ট। যদিও তার আগেই সম্পাদন হয়ে গিয়েছিল ৫ কোটি টাকার বায়না চুক্তি।

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। ১৬ বার শুনানীর পর চলতি বছরের ১০ মার্চ হাইকোর্টের দেয়া ওই নিষেধাজ্ঞা বাতিল করেন সুপ্রীম কোর্টের মহামান্য বিচারক শশাংক শেখর সরকার এবং উর্মি রহমানের দ্বৈত বেঞ্চ। ফলে দূর হয় কুয়াকাটায় নগর ভবনের জমি কেনা সংক্রান্ত আইনী জটিলতা। তবে ইতিমধ্যে বরিশাল থেকে বদলী হয়ে যান তৎকালীন বিভাগীয় কমিশনার রায়হান কাওছার। দায়িত্বে আসেন সদ্য অবসর প্রস্তুতির ছুটিতে যাওয়া সাবেক বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ মাহফুজুর রহমান। তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে জমির দলিল সম্পাদনের উদ্যোগ নেয়া হলেও হঠাৎ করে গত ১৪ মার্চ বিএনপির বরিশাল বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস আক্তার জাহান শিরিনকে বিসিসি’র প্রশাসক পদে নিয়োগ দেয় সরকার। ১৬ মার্চ তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহন করেন সেই দায়িত্ব। ফলে আবারো পিছিয়ে যায় দলিল সম্পাদনের প্রক্রিয়া। পরবর্তিতে বিক্রেতা মোস্তফা শিবলী দলিল সম্পাদনের অনুরোধ নিয়ে বেশ কয়েকবার নগর ভবনের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করলেও বিষয়টির আর কোন অগ্রগতি হয়নি। এদিকে ৬ মাস মেয়াদ দিয়ে গত বছরের ১২ নভেম্বর সম্পন্ন হওয়া জমি কেনার বায়না চুক্তির মেয়াদ ফুরিয়ে যাবে আগামী ১২ মে। সেক্ষেত্রে বায়না চুক্তি বাবদ বিক্রেতাকে দেয়া ৫ কোটি টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে জটিলতায় পড়বে বরিশাল সিটি কর্পোরেশন।

বিষয়টি সম্পর্কে আলাপকালে বরিশালের একজন আইনজীবি বলেন, ‘টাকা যে নগর ভবন ফেরত পাবেনা তা নয়, তবে বিক্রেতা যদি মনে করেন তিনি টাকা ফেরত দেবেন না তাহলে দীর্ঘ মেয়াদী আইনী জটিলতায় পড়তে হবে। জমি কেনার কথা বলে বায়না চুক্তি করেও কেন জমি কিনবে না তার যুক্তিযুক্ত জবাব আদালতকে দিতে হবে সিটি কর্পোরেশনকে। সেই জবাবের বিপরিতে আবার আইনী লড়াই লড়ার সুযোগ থাকবে ক্রেতার। কেননা তিনিও তো ক্ষতিগ্রস্থ। নগর ভবনের সাথে বায়না চুক্তি না হলে তো তিনি এই জমি অন্য কারো কাছে বিক্রি করতে পারতেন। এসব নিয়ে যদি মামলার ঝামেলা তৈরী হয় তাহলে টাকা ফেরত পাওয়া সহজ হবেনা বিসিসি’র জন্য।’

জমি বিক্রেতা মোস্তফা শিবলী বলেন, ‘জরুরী টাকার প্রয়োজনেই আমি জমিটি বিক্রির জন্য সিটি কর্পোরেশনের সাথে রেজিষ্ট্রি বায়না চুক্তি করেছি। মনে প্রানে চাই যে বাকী টাকা দিয়ে জমিটি নিয়ে নিক বিসিসি। নয়তো আমার বিপুল অংকের আর্থিক ক্ষতি হবে।’

নগর ভবন জমি না নিলে বায়না চুক্তির টাকা ফেরত দেবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘জমি বিক্রি করবো বলেই তো বায়না চুক্তি করেছি। তারা না নিলে তো মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্থ হব। শেষ পর্যন্ত যদি জমি না নেয় তাহলে পরবর্তি ব্যবস্থা নেব।’

এই বিষয়ে কথা বলার জন্য বিসিসি’র প্রশাসক বিলকিস জাহান শিরিনকে একাধিকবার ফোন দেয়া হলেও ধরেননি তিনি।

নগর ভবনের মূখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রেজাউল বারী বলেন, ‘বিষয়টি আসলেই জটিলতার দিকে যাচ্ছে। এই টাকা ফেরত পাওয়া যে কঠিন হবে সেটা বুঝতে পারছি। তবে এব্যাপারে সিদ্ধান্ত দেয়ার ক্ষমতা প্রশাসক মহোদয়ের। আমি তার সাথে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করবো। তিনি যে সিদ্ধান্ত দেবেন সেটাই হবে।

বি.দ্র: এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো। বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি। © জনতার বরিশাল