নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশাল নগরীতে প্রতিদিন বিদ্যুতের চাহিদা ৭০ মেগাওয়াট। জাতীয় গ্রিড থেকে সরবরাহ মিলছে ৫৪ মেগাওয়াট। ঘাটতি ১৬ মেগাওয়াট। ফলে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকায় প্রতিদিনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এর মধ্যেই বাংলার টেসলা খ্যাত নগরীর বৈধ-অবৈধ প্রায় ৩০ হাজার ইজিবাইক ও ৪০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ হচ্ছে নগরবাসীর জন্য সরবরাহ করা বিদ্যুতে। এসব যান চার্জে প্রতিদিন খরচ হচ্ছে অন্তত ৬২ লাখ টাকার বিদ্যুৎ। মাসে এর পরিমাণ প্রায় ১৯ কোটি টাকা। এর বড় অংশই ব্যবহার হচ্ছে অবৈধ সংযোগের মাধ্যমে। ফলে একদিকে বিদ্যুৎ চুরিতে রাজস্ব হারাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ, অন্যদিকে সরবরাহ ঘাটতির কারণে লোডশেডিংয়ে ভুগছেন নগরবাসী।
তথ্য অনুযায়ী, নগরীর প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পাকা সড়কে চলাচলের জন্য সিটি করপোরেশনের অনুমোদিত ইজিবাইক রয়েছে ৭ হাজার ৬০০টি। কিন্তু অবৈধ ইজিবাইক যুক্ত হয়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে অন্তত ৩০ হাজারে। এর পাশাপাশি আরও অন্তত ৪০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা অবৈধভাবে চলছে। হিসাব অনুযায়ী ৩০ হাজার ইজিবাইক ও ৪০ হাজার ব্যাটারিচালিত রিকশা পূর্ণ চার্জ করতে প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ২০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ প্রয়োজন। প্রতি ইউনিটের সর্বনিম্ন দাম ১০ টাকা হিসাবে এর মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬২ লাখ টাকা। মাসে এর পরিমাণ প্রায় ১৯ কোটি টাকা।
নগরীতে ব্যাটারিচালিত যান চার্জ দেওয়ার জন্য ওজোপাডিকোর দুটি অঞ্চলের অনুমোদিত চার্জিং গ্যারেজ রয়েছে মাত্র ১২৭টি। এর বাইরে আরও প্রায় ২০০টি অবৈধ গ্যারেজে এসব যান চার্জ দেওয়া হচ্ছে। বৈধ ১২৭টি গ্যারেজের প্রতিটিতে প্রতিদিন গড়ে ২০টি করে যান চার্জ দেওয়া হলেও মোট ২ হাজার ৫৪০টি গাড়ি বৈধভাবে চার্জ দেওয়া সম্ভব। সেই হিসাবে বাকি ৬৭ হাজারের বেশি ব্যাটারিচালিত যান অবৈধ সংযোগে চার্জ হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, এসব অবৈধ গ্যারেজের অধিকাংশে আবাসিক মিটার ব্যবহার করে কম খরচে বাণিজ্যিকভাবে যানবাহনের ব্যাটারি চার্জ দেওয়া হয়। কেউ কেউ বিদ্যুৎ বিভাগের অসাধু কর্মীদের ‘ম্যানেজ’ করে মূল লাইনে হুক বসিয়েও বিদ্যুৎ নিচ্ছেন। নতুন বাজার, পলাশপুর, বটতলা, কাউনিয়া, রূপাতলী, চাঁদমারী, কেডিসি কলোনি, নবগ্রাম রোড, বেলতলা, শায়েস্তাবাদ, আমানতগঞ্জ, জিয়া সড়ক, ভাটিখানা, ধান গবেষণা রোড ও স্টেডিয়াম কলোনি এলাকায় অবৈধ গ্যারেজের সংখ্যা বেশি বলে জানা গেছে।
নগরীর কাউনিয়ার বাসিন্দা মেহেদি হাসান মামুন বলেন, ‘একদিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, অন্যদিকে বাসাবাড়ির মিটার থেকে ব্যাটারিচালিত যান চার্জ দিতে দেখছি। এতে সাধারণ গ্রাহকরা বিদ্যুৎ সংকটে ভুগছেন।’
ইউনিভার্সিটি অব গ্লোবাল ভিলেজ, বরিশালের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী ড. মো. গোলাম সালেহ আহমেদ ছালেম বলেন, ৭০ হাজার ব্যাটারিচালিত যান চার্জে প্রতিদিন প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ লাখ টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার হতে পারে। এতে নগরীর বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। তাই এসব যান চার্জে সোলার সিস্টেম ব্যবহারের বিকল্প নেই। কঠোর নজরদারিতে সোলার সিস্টেম ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে বিদ্যুৎ সংকটের ৯০ শতাংশ সমস্যার সমাধান সম্ভব।
ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের (ওজোপাডিকো) দাবি, বরিশাল বিভাগে বিদ্যুৎ ব্যবহারে অনিয়ম ও অবৈধ সংযোগের বিরুদ্ধে ছয় মাসে ৬৮১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে অবৈধ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ঘটনায় ২৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ওজোপাডিকো-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুল কুমার স্বর্ণকার জানান, তার এলাকায় ৪৭টি গ্যারেজে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে। আর ওজোপাডিকো-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মঞ্জুরুল ইসলাম জানান, তার আওতাধীন এলাকায় প্রায় ৮০টি গ্যারেজ কাম চার্জিং স্টেশনে বাণিজ্যিক মিটার রয়েছে।
ওজোপাডিকোর (পরিচালন ও সংরক্ষণ) বরিশাল সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পরিতোষ চন্দ্র সরকার বলেন, বিদ্যুতের অবৈধ ব্যবহার ঠেকাতে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছি। অবৈধভাবে এসব যান চার্জ করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সিটি করপোরেশনের নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রেজাউল বারী বলেন, অনুমোদনের বাইরে থাকা যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এছাড়া অটোরিকশা ও ইজিবাইক সীমিত পর্যায়ে আনার উদ্যোগও চলছে।